Connect with us

বাংলাদেশ

বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা রক্ষায় করণীয়

Published

on

বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা রক্ষায় করণীয়

 মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী একার পক্ষে উৎপাদন সম্ভব নয়। কোনো কিছুর বিনিময় কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে মানুষ সেবা বা পণ্য ক্রয়-বিক্রয় কিংবা বিনিময় করে থাকে। আর এ পদ্ধতিকে বাজার ব্যবস্থা বলা হয়ে থাকে। অর্থনীতির ভাষায়, বাজার এমন একটি আর্থ-কাঠামো যা একাধিক ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যেকোনো প্রকারের পণ্য, কর্ম-দক্ষতা এবং তথ্য বিনিময়ে সাহায্য করে। তবে প্রতিযোগিতা হলো বাজারের অন্যতম অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে বাজারের আকার বৃদ্ধি পায়। উদ্ভাবন হয় নতুন নতুন পণ্যের কিংবা নতুন বিপণন ব্যবস্থার, অন্যদিকে পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়ে না এবং বাজারে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়। ফলে উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি সৃষ্টি হয় নতুন কর্মসংস্থান। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা থাকে ও বাড়ে প্রবৃদ্ধির হার।

অন্যদিকে বাজারে সুষম প্রতিযোগিতার অভাবে কেবলমাত্র বাড়ে কতিপয় লোকের মুনাফা, কমে যায় উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আর বাড়ে পণ্যমূল্য। বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকলে অর্থ্যাৎ একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে নতুন করে কেউ উদ্যোক্তা হতে সাহস করে না। তাই পৃথিবীর যেকোনো দেশের সরকারের একটি প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য হওয়া উচিত কি করে বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা যায়।

বাংলাদেশ বাজার অর্থনীতির দেশ। এই বাজার ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মেধা, কর্মদক্ষতা, পণ্য বা সেবার মান। কিন্তু আমাদের বাজার অর্থনীতি হয়ে যাচ্ছে যাচ্ছেতাই করার অধিকার। সঠিক প্রতিযোগিতার অভাবে বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দাম বেশি। কাঁচাবাজার, পাইকারি বাজার, শেয়ার বাজার, আমানতের বাজার, ব্যাংক বাজার, ভোগ্যপণ্যের বাজার থেকে বিমানের টিকেটের বাজার পর্যন্ত কোথাও ক্রেতাদের কোন স্বস্তি নেই। বাজারে অনেক সময়ই দেখা যায় জোটবদ্ধতা সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যা অর্থনীতিতে কারটেল নামে পরিচিত। আর আমাদের দেশে তা ‘সিন্ডিকেট’ নামে অধিকতর পরিচিত। এ অবস্থায় গুটি কয়েক বিক্রেতা বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জোট তৈরি এবং বাজারে সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করেন। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়।বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা রক্ষায় করণীয়

ছবি: সংগৃহীত

আবার বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যে দাম ও গণপরিবহনে টিকিটের মূল্য দ্বিগুণ, তিনগুণ পরিমাণ বেড়ে যায় যা সাধারণের কাছে সিন্ডিকেট পন্থা নামে অভিহিত। কয়েকদিন পরপরই খবরের কাগজে প্রতিবেদন ছাপা হয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য বেড়ে চলেছে লাগামহীনভাবে। চাল, ডাল, নুন, তেল, সয়াবিন, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ছোলা, চিনি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ধরতে গেলে সারাবছরই দুলতে থাকে। কখনও চিনির দাম বাড়ছে তো কখনও তেলের দাম। কখনও পেঁয়াজের দাম বাড়তির দিকে তো কাল ডালের দাম। এসব করে কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আমদানি ব্যবসা, বিতরণ ব্যবসা, পাইকারি ব্যবসা দিনে দিনে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমিত হচ্ছে। ফলে নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে ভোক্তারা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে আমাদের দেশে তা লাগামহীনভাবে বাড়ে। আবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বৃদ্ধি অনুপাতে সে দাম আর কমে না। অন্যদিকে ঈদ-পূজা উপলক্ষে বাস-লঞ্চ মালিকরা জোটবদ্ধভাবে পরিবহনের ভাড়া বাড়ান নিজের ইচ্ছেমতো। সঠিক বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না থাকার ফলে আমাদের দেশে ঔষধের দামও আকাশছোঁয়া। সব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, শুধুমাত্র কতিপয় ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে প্রতারণার শিকার হয়েই চলেছে ভোক্তারা। দেশের প্রচলিত আইনে কোনো অপরাধের শাস্তির জন্য যথাযথ প্রমাণ প্রয়োজন; কিন্তু সিন্ডিকেটকারীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রচলিত আইনে সম্ভব হয় না। ফলে সরকার বিব্রত হয় আর ক্রেতাদের বাড়ে সরকারের প্রতি ক্ষোভ।

বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা রক্ষায় করণীয়

ছবি: সংগৃহীত

বাজারের এমন চিত্র থেকে পরিত্রাণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ (ঈড়ষষঁংরড়হ) নিয়ন্ত্রণ, কর্তৃত্বময় অবস্থানের (উড়সরহধহঃ চড়ংরঃরড়হ) অপব্যবহারে রোধ, জোটবদ্ধতা (অপয়ঁরংরঃরড়হ গবৎমবৎ) যা দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক কর্মকান্ডকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করে, এ সকল কর্মকান্ডকে নির্মূল করার জন্য প্রতিযোগিতা আইন তৈরী করা হয়েছে। আইনটিতে মোট ৪৬টি ধারা রয়েছে।

এই আইনটি প্রণয়নের পূর্বে বাংলাদেশে গড়হড়ঢ়ড়ষরবং ধহফ জবংঃৎরপঃরাব ঞৎধফব চৎধপঃরপবং (ঈড়হঃৎড়ষ ধহফ চৎবাবহঃরড়হ) ঙৎফরহধহপব, ১৯৭০ বলবৎ ছিল। প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ প্রনয়নের মাধ্যমে উক্ত আইনটি রহিত করা হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণামূলক তথ্য থেকে জানা যায়, এই আইন প্রকৃতভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার কমপক্ষে ৫ শতাংশ বাড়বে। প্রতিযোগিতা আইনের উদ্দেশ্যসমূহ অর্জন করার উদ্দেশ্যে প্রতিযোগিতা আইনের ৫ ধারা মোতাবেক সরকার বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করেছে।

২০১৬ সালে প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে গঠিত হয় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। মূলত তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ কমিশন গঠন করা হয়েছে। প্রথমত: দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করে তা বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত: বাজারে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি (এককভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ) ও ওলিগপলি (সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ রাখা) অবস্থা জোটবদ্ধ কিংবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা বিরোধী কর্মকান্ড প্রতিরোধ এবং তৃতীয়ত: এমন কিছু হলে তা নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করা। কমিশনের ক্ষমতার বিষয়ে প্রতিযোগিতা আইনে বলা হয়েছে, কোড অব সিভিল প্রডিউসর-১৯০৮ (অ্যাক্ট-৫ অফ ১৯০৮) এর অধীনে একটি দেওয়ানি আদালত যে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন প্রতিযোগিতা কমিশনও একই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের আদেশ লঙ্ঘনে ১ বছর কারাদন্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আইনে অসাধু ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন পত্রিকা মারফত জানা যায় পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে এই কমিশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার সম্ভব হচ্ছে না।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রনয়ন করা হলেও সাধারণ জনগণ এটি সম্পর্কে ততটা জ্ঞাত নয় এবং এর প্রত্যাশামত লক্ষ্য অর্জন করাও সম্ভব হয়নি। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে জনগুরুত্বপূর্ণ আইনটি যথাযথভাবে কার্যকর করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন: এক. প্রতিযোগিতা আইন সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে এবং এ আইন সম্পর্কে বেশি করে প্রচারণা চালাতে হবে। দুই. আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যেন কোনো অপরাধী পার পেয়ে যেতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তিন. বিভিন্ন সমিতি, জোট, ইউনিয়ন অর্থ্যাৎ ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের সংগঠনের কর্মকান্ড বিশেষভাবে মনিটরিং করতে হবে। চার. আধুনিক যন্ত্রপাতি সাধারণের জন্য সহজলভ্য করতে হবে এবং উৎপাদনের যন্ত্রপাতি সামগ্রী আমদানিতে ভ্যাটের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে। পাঁচ. সরকারি উদ্যোগে পণ্য সামগ্রী মজুদ করতে হবে যেন কখনও আমদানি রফতানি বন্ধ হলে দুর্যোগকালীন সময়ে নি¤œবিত্ত ও দুস্থ শ্রেনীর মাঝে নায্যমূল্যে বিক্রয় বা বিতরণ করা যেতে পারে।

ব্যক্তিমালিকানাধীন পর্যায়ে মজুদ করে কেউ যেন বাজারে কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। ছয়. প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় বিসিক শিল্প নগরী কার্যক্রমের আদলে অসংখ্য পাইকারি বাজার সৃষ্টি করা যেতে পারে। সাত. ঢাকার সাথে সারাদেশের নৌ-পথের যোগাযোগের দ্বার উন্মুক্ত করতে পারলে বাজার ব্যবস্থা আরো সুসংহত ও সমন্বিত হবে এবং পণ্যমূল্য স্থিতিশীল হতে সহায়ক হবে। আট. প্রতিযোগিতা কমিশনে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ করতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এর কর্মব্যাপ্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। নয়. কোনো নিরাপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন ভোগান্তির শিকার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। দশ. অভিযোগ দায়ের করার পদ্ধতি সহজতর করতে হবে এবং অভিযোগসমূহ দ্রæত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

এগার. অন্যান্য অধিদপ্তর, কমিশন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে আন্তঃযোগাযোগ এবং সমন্বয় করে প্রতিযোগিতা কমিশনকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বার. প্রতিযোগিতা কমিশনকে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির দ্বারা সমৃদ্ধ করতে হবে। তের. কমিশনকে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করতে হবে এবং উপজেলা চেয়ারম্যান বা উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে বাজার মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে।

চৌদ্দ. প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে জোটবদ্ধ বা সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের অপকর্মের প্রমাণ পেলে জরিমানা করা ছাড়াও লাইসেন্স বাতিল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পনের. প্রতিযোগিতা আইন সম্পর্কিত অধ্যয়ন উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে। ষোল. উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার কর্তৃক বিশেষ ব্যবস্থায় সহজ শর্তে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করতে হবে। সতের. বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা বা বিশেষ কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করে অন্যের ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধার সৃষ্টি করা মারাত্মক অপরাধ তা ওয়াজ-মাহফিল বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণের কাছে তুলে ধরতে হবে।

প্রতিযোগিতা বিরোধী আইন বাস্তবায়িত হলে বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পণ্য ও সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টির ফলে পণ্যে বৈচিত্র আসবে এবং নতুন উদ্যোক্তার বাজারে প্রবেশ সহজতর হবে। এছাড়া রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ অর্জনে অধিক পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশ সম্পর্কে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আরো বাড়বে। এমন প্রেক্ষাপটে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা উত্তোরত্তোর বৃদ্ধি করতে হবে।

বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেবা প্রদানকারী ও সেবা গ্রহণকারীর মধ্যে যাতে কোনো দূরত্ব সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা কমিশনের সাফল্য নির্ভর করবে মানব সম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহের সঠিক প্রয়োগের উপর। প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সাথে সাথে দুর্নীতি ও অনিয়ম কমে যাবে।

প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজার সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতনকরণ, সম্পৃক্তকরণ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশের বাজারগুলোকে বিদেশের সঙ্গে আরো যুক্ত ও উন্মুক্ত করে দিলে বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষ ব্যবসায়ী শ্রেনী গড়ে উঠবে এবং অর্থনীতিতে এর যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে। গার্মেন্টস খাতের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, কোটা প্রথার চেয়ে মুক্ত প্রতিযোগিতায় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সরকারের দক্ষ নেতৃত্বগুণে অর্থনীতি ব্যবস্থা এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির পথে, প্রয়োজন শুধুমাত্র সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।

বাংলাদেশ

দেশীয় চিনিশিল্পের পথিতযশা অবস্থা

Published

on

দেশীয় চিনিশিল্পের পথিতযশা অবস্থা

 

পূর্বের অবস্থা যা ই হোক না কেন এটার বর্তমান অবস্থা যে খুব সোচনীয় তা আমরা আঁচ করতে পারছি খুব ভালো ভাবে এই আলোচনার মাধ্যমে। আবার আমরা এটাও জানতে পেরেছি যে চিনি শিল্পের এই মন্দাবস্থা সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনসাধারণের সহানুভূতি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যদিও এই করুন অবস্থার জন্য দায়ী মূলত শিল্পের সাথে জড়িত নীতিনির্ধারকরা।

আমরা জেনেছি যে বাংলাদেশে সরকারী ১৫ ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ২ টি চিনিকল রয়েছে, এবং ৫ টি চিনি পরোশোধনাগার রয়েছে। এই শিল্পের সাথে ১২.৫ লক্ষ পরিবারের প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকা জড়িত রয়েছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের আখ চাষ এবং চিনি আহরণের হার খুবই কম। দেশে প্রতি একরে আখ উৎপাদন হয় মাত্র ১৫ মেট্রিক টন যা হাওয়াই অঙ্গরাজ্যে ৭০ মেট্রিক টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। আবার চিনি আহরিত হয় মাত্র ৭.৪ % যা অস্ট্রেলিয়া ১৫.৭ % পর্যন্ত হয়ে থাকে।

দেশীয় চিনিশিল্পের পথিতযশা অবস্থা

চিনিশিল্প

চিনি শিল্পে ধস মোটামুটি শুরু হয়েছে ২০০০ সালের পরবর্তী সময় থেকে। অথচ ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে কিন্তু বাংলাদেশে মোট আখ উৎপাদিত হয়েছিলো ২০ লাখ ৯৬ হাজার ২০০ মেট্রিক টন এবং চিনি উৎপাদন হয়েছিলো ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬২ মেট্রিকটন। যা প্রায় ৮.৭৭ %। কিন্তু ২০০০-০১ মৌসুমে সেটা কমে হয় ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৬ মেট্রিকটন এবং চিনি আহরিত হয় ৯৮ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন। যা কমে হয় ৭.১১ %।

মূলত জলবায়ু পরিবর্তন,তুলনামূলক কম সূর্যালোক ঘণ্টা, আগাম আখ চাষের জমির পরিমাণ হ্রাস, নিচু জমিতে আখ চাষ, উচ্চ চিনি আহরণযুক্ত ইক্ষু জাতের অভাব, অপরিপক্ক আখ মাড়াই, পুরাতন যন্ত্রপাতি ও মিলের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কমতে থাকে চিনি আহরণ হার ও মোট চিনি উৎপাদন।

২০১০ সাল পরবর্তী সময়ে চিনি আহরণ হার ও মোট চিনি উৎপাদন হটাৎ এমন খাপছাড়া কেন হয়ে যাওয়ার পেছনে যে কয়েকটি কারণ মূখ্যভাবে দায়ী তা হলো ‘ চাষীরা আখ বিক্রির টাকা সময় মতো না পাওয়া, আখের বদলে অন্য ফসল চাষে তুলনামূলক বেশী লাভ, চিনি মিল গুলোর কাছে চাষীদের প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আটকে থাকা, পাওয়ার ক্রাশারের আগমন, এবং সরকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল আচরণ না করা।

চিনি উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পিছনে রয়েছে মানসন্মত আখের অভাব, মাটি ও আবর্জনা যুক্ত আখ মিলে সরবরাহ, ধারণ ক্ষমতার চাইতে বেশি আখ মাড়াই করে রস ড্রেনে ফেলা, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্লাটফর্মে ও মাঠে আখ শুকানো, আখ থেকে রস ঠিকমত বের না করা, সর্বপরি দক্ষ জনবলের অভাবে চিনি আহরণে ব্যাপক গড়মিল তৈরি হচ্ছে।

শুধু চিনি উৎপাদনেই লোকশান হচ্ছে না। অদক্ষ জনবল, পরিকল্পনার অভাব, নিম্নমানের আখ চাষ, ক্রয় বিক্রয়ে দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয় খরচ, ব্যায়ের খাত বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন অনিয়ম যেন বাসা বেঁধে বসেছে চিনিকলগুলিতে।ফলে কিছু কিছু কর্মকর্তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটলেও চিনিকলগুলির এবং শ্রমিকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

চিনি শিল্প একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিকারী পণ্য হতে পারে এবং কতগুলি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বাংলাদেশ এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করতে পারে, যেমনঃ কারখানাগুলির আধুনিকীকরণ, পূর্ণমাত্রায় আখ উৎপাদন, সহজশর্তে আখচাষীদের ঋণ প্রদান, রিফাইনারিগুলিকে পূর্ণমাত্রায় চিনি উৎপাদনের জন্য অনুমতি প্রদান, আখ চাষে ও চিনি উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা প্রতিরোধ, মিল কর্মচারীদের অপকর্ম থেকে বিরত রাখা এবং চিনিকলগুলি থেকে উৎপাদিত উপজাত পণ্যের (by-products) সঠিক ও ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

লিখেছেনঃ
মারুফুজ্জামান
৪৬ তম আবর্তন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।

Continue Reading

বাংলাদেশ

জাতির জনকের শাসনকালঃ দেশনীতি ও বিদেশনীতি

Published

on

Bangabandhu-Sheikh-Mujibur-Rahman
আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে দেখেছি, যিনি জ্ঞানে ও নেতৃত্বে হিমালয় সম” -বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর এই বাণী ই জাতির জনক সম্পর্কে অজানা বিষয় জানতে কৌতূহলী করে তোলবে যেকোনো মুজিবপ্রেমী ব্যাক্তি কে। বঙ্গবন্ধু সোনার  বাংলা  গরে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পান নি, কিন্তু সদ্যস্বাধীন দেশটি নিয়ে তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফলশ্রুতিতেই আজকে আমাদের এই দেশ বিশ্বের অনেক দেশের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি প্রিয় নেতা পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১১ জানুয়ারি অস্থায়ী সংবিধান আদেশের মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার সূত্রপাত এবং মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার কাঠামো প্রবর্তন করেন। আজকের এই দিনে স্বল্পসময়ে জাতির জনকের গৃহীত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক  বিভিন্ন পরিকল্পনা, পররাষ্ট্র নীতি সহ সংক্ষেপে তাঁর  শাসন কাল আলোকপাত করা হলো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের প্রিয় এই নেতা খুব অল্প সময়েই আলোচিত উঠেন তাঁর বন্ধুত্বপূর্ন আচরণ,বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী  সিদ্ধান্ত দক্ষতার মাধ্যমে। এই স্বল্প সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংগঠন যেমন জাতিসংঘ, ওআাইসি সহ ১২৬ দেশের স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র নেতার সান্নিধ্য লাভ করতে পেরেছিলেন। তাছাড়াও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক  মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণ, অবাঙালিদের রেখে যাওয়া শিল্প কারখানায় দেশের জনগণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাকরণ, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা,স্বীকৃতি ও সহযোগিতার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা করা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অসামান্য অবদান রেখে গিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিশ্ব নেতাদের ক্রোধের ফল সরূপ সৃষ্ট  ভয়াবহতা অনুধাবন, পাকিস্তানের শাসন,নির্যাতনের বিরুদ্ধ আন্দোলনের সম্মুখযোদ্ধা  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করে। সকল দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রিয় বাংলা কে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড হবে হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাইতো তিনি ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি গ্রহন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ভারতের সাথে অকৃত্রিম বন্ধুত্ব স্থাপন করেন বিপরীত দিকে তাঁর  গৃহীত কৌশলপূর্ণ নীতির কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধিতাকারী চায়না আজকের বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম সহযোগী হয়ে উঠেছে।মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার বিরোধী ভূমিকা সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালের ১ অক্টোবর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড  আর ফোর্ডের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে মিটিং করেন।১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত নিরপেক্ষ আন্দোলন এর শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তিতে ন্যামের সদস্য রাষ্ট্রদের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তাদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহন করেন। পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত কূটনৈতিক কৌশল সফল হয়। ফলে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভের মাধ্যমে প্রিয় দেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতি অঙ্গনে নিজস্ব স্থান তৈরি করে নেয়।এবং ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু যা সারা বিশ্বের অধিকারহারা শোষিত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman in United Nations নব্যস্বাধীন দেশ বিধায় তখনো রাষ্ট্রের সামাজিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিলো নানাবিধ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান। অভ্যন্তরে ছিলো পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিচারের দাবী অন্যদিকে দেশের স্বীকৃতি অর্জনে পাকিস্তানের মিত্র দেশগুলোর বিরোধিতা। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বিপ্লবী মনোভাব জাগ্রত করতে সহায়তা করে। স্বাধীনতা অর্জনের ১ বছরের মধ্যে ই আওয়ামী লীগের ছাত্র সমাজের একাংশ গড়ে তোলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল(জাসদ)। দ্বিধা বিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি গুলো দেশে এনজিও এর মাধ্যমে সহযোগিতা  কার্যক্রম চালু রাখে যা পরবর্তী তে দেশে প্রধান শক্তি হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগের ওপর ছিল দেশ পুনর্গঠনের সামগ্রিক চাপ কিন্তু কাজের ফলাফল ছিল ধীর।  এই সময়ে অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগ ওঠে এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রবল হয়ে উঠে যা উগ্রপন্থী যুব নেতৃত্ব  ও মধপ্যন্থী মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ে।এ পরিস্থিতিতে সরকার পাকিস্তানি সেনাদের মুক্তি দান করে ও আওয়ামীপন্থী বিশ্বাসীদের নিয়ে উগ্র পন্থীদের দমনে রক্ষী বাহিনী গঠন করে। নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র থেকে আমরা জানি,প্রতিটি ক্রিয়ার ই সমান ও বিপরীত ক্রিয়া থাকে,তেমন জাতির জনকের শাসন কালেরও আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে, তাই বলে একটি রাষ্ট্রের জন্ম যার হাত ধরে তাঁর পরিবারের এমন নৃশংস হত্যাকান্ড কখনো গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman family photo 15 august দেশগঠনে অকৃত্রিম প্রচেষ্টা কারী এই রাষ্টনায়কই কতিপয় সেনাবাহিনীর অফিসারের রোষের কবলে পড়ে প্রিয় পুত্র শেখ রাসেল,২ পুত্রবধূ, সকল বিপদে সাহস প্রদানকারী স্ত্রী সহ পরিবারের আরো সদস্য নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন। প্রিয় বাংলার শোষিত জনগণের কল্যাণে আত্ননিয়োগকারী রাষ্ট্র নায়ক,জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজ তম মৃত্যুবার্ষিক,তাঁর প্রতি জানাই পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।

Continue Reading

বাংলাদেশ

জ্ঞানহীন এক জাতির করোনা কাহিনী

Published

on

জ্ঞানহীন এক জাতির করোনা কাহিনী
১.লেখার শুরুতে একটা হাসির গল্প বলে নিতে চাই। করোনা পরিস্থিতিতে সবকিছু বন্ধ হয়ে গেলেও চালু রাখতে হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এক ব্যাংক কর্মকর্তা আর গ্রাহকের কথোপকথন হচ্ছে। গ্রাহকটি ব্যাংকে মোটামুটি অংকের টাকা তুলতে এসেছেন। কর্মকর্তাটি গ্রাহককে প্রশ্ন করলেন সবকিছু বন্ধের মধ্যে তিনি কেন টাকাগুলো তুলছেন? গ্রাহক জানালেন, লকডাউনে বাসায় বসে থাকতে গিয়ে বিরক্ত তিনি। বাইরের পরিবেশ দেখতে আর বিরক্তি কাটাতে ব্যাংকে চলে এসেছেন । হাতে চেক বই দেখে রাস্তায় পুলিশও তাকে কিছু বলেন নি। কর্মকর্তাটি গ্রাহকের এমন বক্তব্যে হতবাক হয়ে গেলেন। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে টাকাগুলো গুনে নিয়ে দ্রুত সেই লোকটিকে বাড়ি চলে যেতে বললেন কর্মকর্তাটি।লোকটি আরো অবাক করে দিয়ে তাকে জানালেন, গোনার দরকার নেই। টাকাগুলো যেভাবে আছে সেভাবেই কাল এসে জমা দিয়ে যাবেন তিনি। ব্যাংকগুলো খোলা রাখায় লকডাউনের বিরক্তি কাটাতে সুবিধা হয়েছে তার। ব্যাংকেও আসা হয় বাইরের পরিস্থিতিও নিজ চোখে দেখা যায়! এই গল্পটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে আমার নজরে আসে। সারাদেশের কার্যত লকডাউনের মধ্যে ব্যাংক খুলে রাখায় ক্ষুব্ধ ব্যাংকিং খাতে কাজ করা মানুষেরা। তাদেরই একজন গল্পটি ছড়িয়ে দিয়েছে৷ আর তাঁর কল্যাণেই এমন নিদারুণ হাস্যরসের গল্পটি জানতে পেলাম। আশা করছি গল্পটি মিথ্যা হবে। বৈশ্বিক বিপর্যয়ের এই সময়টাতে কোনো মানুষ গল্পের গ্রাহকের মতো কাজ করবে না বলে বিশ্বাস করতে চাই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই আরেকটা ভিডিও দেখে এই জাতিকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। একজন পুলিশ সদস্য একা একা মাইকিং করে এই করোনা বিপর্যয়ের সময়টাতে সবাইকে ঘরে থাকার আহবান জানাচ্ছেন। আশেপাশের সবাই তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে সে কেনো হাতে লাঠি নিয়ে আসে নি! লাঠি না নিয়ে কেন সে মানুষকে বোঝাতে আসলো সেটা অনেকের মনে দুঃখ দিয়েছে। আসলেই কি আমরা এমন জাতি যাদের পিঠে লাঠির আঘাত না পড়লে নিজেদের ভালোটুকু বুঝবো না?
জ্ঞানহীন এক জাতির করোনা কাহিনী

২.

আমি যে মুহুর্তে এই লেখাটা লিখছি তখন সারাবিশ্বে করোনায় মারা গেছেন এক লক্ষ মানুষ। পুরো পৃথিবীটাই এক প্রকার ঘরে বন্দী অবস্থায় আছে। এই অবস্থায় সবাই মিলে ঘরে থাকার ফলে প্রকৃতির ওপর প্রভাব পড়েছে অসাধারণ। বাতাসে দূষণ কমে গেছে, আশপাশ পরিষ্কার হয়েছে। দীর্ঘদিন পর অনেকটা দূর থেকে নাকি হিমালয় দেখা যাচ্ছে, কক্সবাজারে ডলফিন ফিরে এসেছে। নেটিজেনরা ( ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অংশ হওয়া মানুষদের এই শব্দ দিয়ে অভিহিত করা হয়) মজা করে বলছে, প্রকৃতির এত কিছু ফিরে আসার মধ্যে মানুষের জীবনে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিক/প্রমিকারাও হয়তো ফিরে আসবে! তবে জীবনে পুরনো প্রেমিক/প্রেমিকারা ফিরে না আসলেও সমাজের পুরনো একদল মানুষ কিন্তু ঠিকই ফিরে এসেছে। তারা হচ্ছেন ত্রাণের চাল চোর সম্প্রদায়। এই মুহুর্তে দেশের মোট করোনা শনাক্ত মানুষের চেয়ে সরকারি ত্রাণের চাল চুরি করা মানুষের সংখ্যা বেশি। সারাবিশ্ব যেখানে মৃত্যুভয়ে থমকে গেছে সেখানে আমাদের চাল চোরেরা পুরনো প্রতাপে খবরের শিরোনাম হচ্ছে। সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত করোনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুহার বাংলাদেশে৷ কোভিন ১৯ শনাক্ত মানুষের চেয়ে নিশ্চিত ভাবে এই রোগে মৃতের সংখ্যার তারতম্য খুব বেশি নয়৷ এমন একটা ভয়ানক সময়ে দাঁড়িয়ে এইসব চাল চোরদের জন্য আমার কেন জানি মায়া হয়! স্রষ্টা না করুক করোনা ভাইরাসেই যদি চাল চোরেরা মারা যায় তবে চুরিকরা এসব চালগুলোর জন্য তাদের আফসোস হবে। মৃত্যুর পরেও তাদের আফসোসের কথা ভেবেই আমার খারাপ লাগছে।

জ্ঞানহীন এক জাতির করোনা কাহিনী
৩.

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি ভিডিও আমার বেশ মনোযোগ আকর্ষণ করলো। সেই ভিডিওতে দেখলাম এক ইউপি সদস্য করোনা পরিস্থিতিতে ত্রাণ নিতে আসা কিছু বেরোজগার মহিলার ওপর চোটপাট করছে। তাঁর চোটপাট এবং হুংকারের কারণটা জেনে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম। আহারহীন মানুষদের তিনি জোর গলায় শাসাচ্ছেন এবং ত্রাণ দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। কারণ ত্রাণ সহযোগিতা তিনি তাদেরকেই করবেন যারা নাকি তার নিজ রাজনৈতিক দলের অনুসারী! ভিডিওটা দেখে মর্মাহত হলাম। মনে মনে বিশ্বাস করতে চাইলাম আমার দেখাটা যেন ভুল হয়। করোনা ভাইরাস কোন দল চেনে না। সে চেনে মানব দেহ। তাঁর সংস্পর্শে যে শরীরটা আসবে তাকেই সে আক্রমণ করবে৷ করোনার আক্রমণ থেকে যদি নিজেদের নিরাপদ রাখতে হয় তবে মানুষকে ঘরে রাখতে হবে৷ কিন্তু ঘরে খাবার না দিয়ে তো আপনি তাদের ঘরে রাখতে পারবেন না। কারণ কষ্টকর সত্য হচ্ছে এই যে পেটের ক্ষুধা করোনা ভয় মানে না। সারাবিশ্বকে থামিয়ে দিলেও করোনা মানুষের পেটের ক্ষুধা থামাতে পারে নি। আর সেই ক্ষুধার যন্ত্রণায় প্রথমে বাইরে বের হবে আয়হীন মানুষ, তারপর বের হবে নিম্ন আয়ের মানুষ, তারপর স্বল্প আয়ের। এভাবে করে ঘরে যাদের খাবার কিছুই থাকবে না তারা সবাই রাস্তায় বের হয়ে যাবে৷ আর বাস্তবতা হচ্ছে এই করোনা আক্রমণ থেকে নিজে বাঁচতে হলে অন্যদের নিয়েও বাঁচতে হবে। কারণ এই ভাইরাসটি কেবলমাত্র তখনই থামবে যখন সংক্রমণের জন্য একটি মানবদেহও আর সে খুঁজে পাবে না। আর মানবদেহগুলোকে যদি ভাইরাস থেকে দূরে রাখতে হয় তবে সেগুলোর পেটের ক্ষুধার সংস্থান করাও আবশ্যক। মানুষদের খাবারের দুঃশ্চিন্তা নির্মুল করে বাইরের সমাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। কিন্তু সেই চিন্তা দূর করার পদক্ষেপে যদি অতিউৎসাহী এসব ইউপি সদস্যদের উপস্থিতি বেশি হয়ে দাঁড়ায় তখন কিন্তু গন্ডগোল।যারা কিনা মনে করে গণমানুষের মতামত নিয়ে তারা নিজেদের সরকার বাহাদুর নাম রেখেছে। সেই বাহাদুরকে কিন্তু এইসব চ্যালাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বাহাদুরি দেখাতে হবে। বাহাদুরি দেখাতে হবে চাল চোরদের শায়েস্তা করার ক্ষেত্রেও। নয়তো দলকানা ইউপি সদস্য আর চাল চোর চেয়ারম্যানরা মিলে জনগণ নামক বস্তুটিকে খেপিয়ে তুলবে।শুনেছি ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর আইয়ুব খানের শাসন’ দুটোই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বস্তু ছিল। বাঙালী খেপে গিয়ে কিন্তু আইয়ুব খানের কঠিন সামরিক শাসনকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিলো।

জ্ঞানহীন এক জাতির করোনা কাহিনী
৪.

পৃথিবীব্যাপী করোনাক্রান্ত লাখ খানেক মৃত্যুর মধ্যে চিকিৎসা সেবায় জড়িত অনেকেও কিন্তু মারা গেছেন৷ করোনা বিপর্যয়কে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ধরে প্রতিটি দেশের মৃত চিকিৎসা পেশার মানুষদেরকে দেওয়া হচ্ছে শহীদের খেতাব। কারণ সবাই জেনে গেছে এই যুদ্ধে সেনাপতি – সৈনিক যুদ্ধাস্ত্র হাতে নিয়ে বিরোধী শিবিরে গুলি চালানো কেউ নয়। অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে দিনরাত মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাওয়া লোকগুলোই এই যুদ্ধে আমাদের বড় শক্তি। এদেশে প্রথমেই যখন করোনায় মৃত্যুর মিছিল শুরু হলো তখনই আক্রান্ত হওয়া শুরু করলো একে একে ডাক্তারেরা। আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের চিকিৎসা সেবায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে কমিউনিটি ক্লিনিক। সাংবাদিকতার সূত্রে আমার জেলার কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো এই সময়ে কেমন সেবা দিচ্ছে সে ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছিলাম। যে ভয়াবহ তথ্য জানতে পারলাম সেটা উল্লেখ করতে চাচ্ছি। করোনায় শুরুতেই ঢাকা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে লোক এদিকটায় এসেছিলেন৷ লকডাউনের শুরু হলে কিছু কিছু সরকারি হাসপাতাল সহ অধিকাংশ বেসরকারি ক্লিনিক গুলোয় রোগী দেখা সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময়টাতে অধিকাংশ অসুস্থ রোগীরা চিকিৎসা নিয়েছে এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে। মৌসুম পরিবর্তনের কারণে রোগীদের বেশিরভাগই ছিল সর্দি-জ্বর, কাশি- গলাব্যথা সহ করোনার অন্যান্য উপসর্গ সমৃদ্ধ। এ পর্যন্ত ঘটনা সাধারণ চোখে এক প্রকার ঠিকই ছিল। কিন্তু ভয়াবহ কথাটা জানা গেলো এরপরে। আমার জেলার কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা এই লেখাটার সময় পর্যন্ত কোনো ধরনের জীবাণুরোধী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী (পিপিই) পান নি। সম্পূর্ণ অনিরাপদ অবস্থায় তারা রোগী দেখেছেন। এমন চিত্র আমি মনে করি সারাদেশের। সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে বড় চিকিৎসক সবাইকেই একটু বেশি নিরাপত্তায় রাখতে হবে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই। যদিও তাদের কিছু অংশের কার্যক্রম নিয়ে খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবুও এটা ভুলবাবর কোন জো নেই যে স্রষ্টার পর আমাদের এই বিপদে রক্ষাকর্তা তারাই।বেঁচে থাকলে চিকিৎসকদের কাজের সমালোচনা করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু এই সময়ে অন্তত তাদেরকে অনুপ্রেরণা দেই। নিজেদের প্রয়োজনে তাদের সাহস যোগাই। হয়তো চিকিৎসা অব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যখাতের খারাপ দশা, স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোভাব সব মিলেমিশে একাকার হয়ে চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তবে যেটাই হোক এর মধ্যেই বাঁচার চেষ্টা করে যেতে হবে। নিজে বাদে অন্য সবার দোষ ধরে আমাদের সময়টা কেটে যেতে পারে কিন্তু বাঁচতে হলে এসবের মধ্যেই লড়াই করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত বিশ্বে করোনা প্রতিরোধক কোনো যথার্থ চিকিৎসা ব্যবস্থা আবিষ্কার না হয় ততদিন যারই দোষ ধরি না কেন মৃত্যুর মিছিল থামাবার কোনো উপায় নেই। এই বাস্তবতা বাংলাদেশ কিংবা আমেরিকা সব জায়গাতেই এক। তাই ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ আদর্শই ধারণ করতে হবে। নিজে যথাসম্ভব সঙ্গ বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। যত খারাপই লাগুক সরকারি নির্দেশনা মানতে হবে, মানাতে হবে৷নিজেদের কাণ্ডজ্ঞানের অভাবে ‘এই শহরে আর কেউ বেঁচে নেই’ – এমন বাক্য আমরা কেউই শুনতে চাই না।

লেখক: শফিক মুন্সি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।

Continue Reading

সর্বাধিক পঠিত