Connect with us

মুক্তিযুদ্ধ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’

Published

on

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং এম আর আখতার মুকুলের 'চরমপত্র'

কি পোলারে বাঘে খাইলো? শ্যাষ। আইজ থাইক্যা বাঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ। ঠাস কইয়্যা একটা আওয়াজ হইলো। কি হইলো? কি হইলো? ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পিয়াজি সা’বে চেয়ার থনে চিত্তর হইয়া পইড়া গেছিলো। আট হাজার আষ্টশ’ চুরাশি দিন আগে ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট তারিখে মুছলমান মুছলমান ভাই ভাই কইয়া, করাচী-লাহুর-পিন্ডির মছুয়া মহারাজারা বাঙ্গাল মুলুকে যে রাজত্ব কায়েম করছিল, আইজ তার খতম তারাবি হইয়া গেল।’

স্বাধীনতা যুদ্ধ বা এর উত্তর, যে প্রজন্মেরই বাঙালি হন না কেন, উপর্যুক্ত লেখাটি পড়ার সময় আপনার মস্তিষ্ক যদি আপনার কানে এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র পাঠের কণ্ঠধ্বনি শুনাতে ব্যার্থ হয় তবে এই লেখাটি আপনার জন্য।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই দিনগুলোতে (২৫ শে মে ১৯৭১ থেকে ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত প্রচারিত হতো ঐতিহাসিক এই অনুষ্ঠানটি । পর্যবেক্ষকদের মতে এখন পর্যন্ত বাঙালী রেডিও-টেলিভিশনের প্রচারিত অনুষ্ঠানের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হিসেবে ধরা হয় এই ‘চরমপত্র’-কে। যার স্রষ্টা ছিলেন এম আর আখতার মুকুল, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে সাথে নিজের ও চরমপত্রের নাম এমন ভাবেই যোগ্য করে তুলেছিলেন, যাদের ইতিহাস না জানলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস জানা অপূর্ণ থেকে যায়।

আমার এই লেখায় এম আর আখতার মুকুল এর ‘চরমপত্র’, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে এর প্রাসঙ্গিকতার এবং জনমানুষের কাছে এর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

প্রথমেই চরমপত্রের প্রাসঙ্গিকতা এবং জনপ্রিয়তার কারণ

সময়টা ১৯৭১, ভয়-অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার ভিতরে স্বাধীনতাকামী বাঙালির হৃদয়ের আনন্দ এবং অনুপ্রেরণার রসদ হিসাবে কাজ করেছে চরমপত্র। ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে চরমপত্র মুক্তিযোদ্ধাদের কেবল উৎসাহ-উদ্দীপনাই দেয়নি একেবারে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যে ভরপুর এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এম আর আখতার মুকুল দুর্বোধ্য রাজনৈতিক তত্ত্ব ও রণনীতির ব্যাখ্যাও করেছেন। তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতি এবং রণাঙ্গনের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের।
আপামর জনসাধারণের কাছে চরমপত্র অনুষ্ঠানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হতে পারে দুটো, প্রথমত, এর প্রাঞ্জল ভাষা। দ্বিতীয়ত, ব্যঙ্গাত্মক কৃত্রিম অথচ ভিন্ন কণ্ঠস্বর এর ব্যবহার। প্রধানত ঢাকাইয়া তথা বাঙলা ভাষার সঙ্গে একাত্মতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে। মোট মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে শতকরা ৯৫ জন গ্রাম বাংলার সন্তান হওয়ায় চরমপত্রের এমন ভাষার ব্যবহার স্বভাবতই তাদের কাছে প্রাঞ্জল ছিল। এমনকি লেখক কাজী নজরুল ইসলামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে উর্দু ও ফারসি শব্দের পর্যাপ্ত ব্যবহার করেছেন। নতুন নতুন শব্দ উচ্চারণ এবং এর ব্যবহার যা পরবর্তীতে বাংলাভাষাকে নানা দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এসকল আঞ্চলিক ভাষা এবং মিশ্র শব্দের সুগঠিত ব্যবহারের মাধ্যমে একটা রচনা সর্বগ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠার কারণ, গবেষণার বিষয় বস্তু হতে পারে। 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চরমপত্র প্রকাশের ইতিহাস

১৯৭১ সালের ২৫ মে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম শতবার্ষিকীতে যাত্রা শুরু করেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বেতার কেন্দ্রের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ৫০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন ট্রান্সমিটার সংগ্রহ করে তা প্রচার উপযোগী করার জন্য রাজশাহী সীমান্তে পলাশীর আম্রকাননে সেটা স্থাপন করেন। তারই নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার ও প্রপাগান্ডা শুরু করেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মীরা।
এদিকে এম আর আখতার মুকুল মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার অধিকর্তা ছিলেন বিধায়, এই নির্বাসিত সরকারের সকল কর্মকান্ড অন্তরঙ্গ আলোকে অবলোকন করতে পেরেছিলেন। তাছাড়া নিয়মিত রণাঙ্গন পরিদর্শন এর অভিজ্ঞতা চরমপত্র এর স্ক্রিপ্ট লিখতে তাকে সাহায্য করেছে। তার এই অনুষ্ঠান প্রচারের লক্ষ্যে রেক‌ডে ধারণ করার জন্য কলকাতা বালিগঞ্জের সেই বাড়িটির রেকর্ডিং স্টুডিওতে সময় মত হাজির হতে হতো তাকে, যে বাড়ির একাংশে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মী এবং শিল্পীদের।

সময়মত চরমপত্র অনুষ্ঠানটি প্রচার এর জন্য নিয়মিত ভোর চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠতে হতো এম আর আখতার মুকুলকে। প্রতিদিন চরমপত্রের স্ক্রিপ্ট রচনার পেছনে তার সহধর্মিণীর মাহমুদা খানম রেবার স্বামীর প্রতি শাসন ও অনুপ্রেরণা অনস্বীকার্য। কারণ লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার সহধর্মিনী তাকে সকালের নাস্তা পর্যন্ত দিতেন না। আর এই অনুষ্ঠানের জন্য স্ক্রিপ্ট লেখা এবং ব্রডকাস্ট এর জন্য তার পারিশ্রমিক নির্ধারিত ছিল ৭ টাকা ২৫ পয়সা মাত্র। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বাঙালি জাতির সবথেকে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান চরমপত্র। “চরমপত্র” অনুষ্ঠানটি নামকরণ করেছিলেন তৎকালীন বেতার কর্মী আশফাকুর রহমান খান।

বৈচিত্র্যময় প্রতিটি স্ক্রিপ্ট

চরমপত্রের প্রত্যেকটি স্ক্রিপ্ট ছিল হাস্যরসের পরিপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময়। প্রতিটি স্ক্রিপ্ট এবং তা ব্রডকাস্টিং এর পিছ‌নে এম আর আখতার মুকুল ছোটবেলা থেকেই বাউন্ডু‌লে স্বভাব এবং বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সবথেকে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স গ্রাজুয়েট এবং ক্যালকাটা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত বাবার প্রতিটি বদলির সাথে সাথে ছোটবেলা থেকেই স্কুল বদল হত এম আর আখতার মুকুলের। ১৯৪৫ সালে ‌ম‌্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। ইতিমধ্যে অসংখ্যবার স্কুল বদলির কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা এবং সংস্কৃতির সাথে ছোটবেলা থেকেই তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে তার অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী হয় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে। তি‌রিশ দশকের ‘সন্ত্রাসী আন্দোলন’, বিয়াল্লিশের অসহযোগ আন্দোলন, ৪৩’ এর দুর্ভিক্ষ, ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, ১৯৪৭ এর ইংরেজদের ‌বিদায় এবং ভারত বিভাগের ঘটনাবলী তার অভিজ্ঞতা পূর্ণ করেছে। ১৯৪৯ সালে দিনাজপুর জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় বি এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এম আর আখতার মুকুল। সে বছর পাশের শতকরা হার মাত্র ২১ জন। দিনাজপুর কলেজ থেকে ৬৫ জনের মধ্যে মাত্র ৬ জন পাশ করেছিল, তার ভিতরে একজন ছিলেন এম আর আখতার মুকুল। জেলখানার ভিতরে রাজনৈতিক বন্দীদের সাথে বিশেষ করে বাম রাজনীতির সাথে জড়িত নেতাদের সাথে উঠাবসা সুযোগ হয় তার। পরবর্তীতে পেশা হিসেবে তিনি সাংবাদিকতা কে বেছে নিলে তৎকালীন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক আন্দোলনের প্রত্যেকটি ঘটনা তার অভিজ্ঞতা কে আরো সমৃদ্ধ করে। রাজনৈতিক পেশায় তিনি উত্তরোত্তর সাফল্য পেয়েছেন বটে। ১৯৬৪ সালে জুলাই মাসে সাংবাদিক হিসেবে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় ওই সফরে সাংবাদিকদের সবাই অবাঙালি, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিনিধি, একমাত্র ‘সবেধন নীলমণি’ ছিলেন এম আর আখতার মুকুল। তাছাড়া তিনি ১৯৬৫ সালে তুরস্ক সফর করেন। খুব কাছ থেকে পাকিস্তান সরকারের কূটনৈতিক বিষয়গুলিও লক্ষ্য করার সুযোগ হয়েছে তার। তৎকালীন বিশ্ব নেতাদের সাথে সাক্ষাৎকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কার্যাবলী বিদেশ সফর থাকা অবস্থায় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। অবশেষে ১৯৭১, ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিচিত্র অভিজ্ঞতা সাথে ভাষাশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে সৃষ্টি করেন বাঙালির ইতিহাসের এক অনন্য সৃষ্টি ‘চরমপত্র’।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ব্যক্তিগত ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল এই চরমপত্র। চরমপত্র যার পুরোটা অংশজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে এই ‘চরমপত্র’

প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।

বাংলাদেশ

বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু যেভাবে (শেষ পর্ব)

Published

on

বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু যেভাবে (শেষ পর্ব)
৭ই মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণ ইয়াহিয়া ও তাঁর তাবেদারদের অপ্রস্তুত করে দেয়। ভাষণে মুজিব সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করলেও তাঁর মনের ইচ্ছা বুঝতে বাকি নেই জান্তা সরকারের৷ ‘অপারেশন ব্লিৎজ’ নিয়ে একটু শঙ্কা তৈরি হয় ইয়াহিয়ার মনে। আরো বড় নারকীয় কিছুর পরিকল্পনা করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে বাঙালীর হাতে ক্ষমতা দেবার কলা দেখিয়ে। শেখ মুজিব আর আওয়ামীলীগকে ব্যস্ত রাখতে হবে আলোচনা আলোচনা খেলায়। আর প্রস্তুতি শেষ হলে পুরো বাঙালীকে আচ্ছা টাইট দিয়ে সোজা করতে হবে৷ কতভাবে সোজা করবে সেটা ভেবেই কিছুটা অস্থির হয়ে গেলো ইয়াহিয়া খান। শ্যামবর্ণের বাঙালী মেয়ে গুলো ইয়াহিয়ার অস্থিরতা দূর করতে পারবে না। কচি মেয়ে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলে এসব অস্থিরতা দূর হবে। আর সেই কচি-কুমারী মেয়েগুলোকে হতে হবে পাঞ্জাবি অথবা সিন্ধ। ঢাকায় বসে এ ধরনের কচি মেয়ে না পেয়ে মনটা আনচান করছে ইয়াহিয়ার। বারবার মনে পড়ছে আকলিমের কথা। আকলিমের কাছে এসব মেয়ে পাওয়া দুমিনিটের ব্যাপার। আকলিমের মুখে মুখ লাগিয়ে কতদিন হয় শরাব পান বন্ধ! মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় বসে ইয়াহিয়া ভাবছেন বাঙালীদের একটা শিক্ষা দিয়েই তিনি করাচি উড়াল দেবেন। উড়ে গিয়ে পড়বেন একদম তাঁর পেয়ারের বেশ্যারানী আকলিমের কোলে। আকলিমের সঙ্গে ইয়াহিয়ার অতি দহরম – মহরমের কারণে এই নারীর নাম হয়ে গেছে জেনারেল রানী।১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন ইয়াহিয়ার মতো পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমি কোন শক্তিই মেনে নিতে পারে নি। এমনকি কেউ ভাবতেও পারে নি ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন আওয়ামীলীগ অর্জন করবে৷ নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা সংস্থা গুলোর রিপোর্টে বলা হয়েছিল সবমিলিয়ে ৮০-৯০ টা আসন আওয়ামীলীগ পেতে পারে৷ বড় দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিও একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হবে বলে রিপোর্ট এসেছিলো। এসব রিপোর্ট দেখে ইয়াহিয়া নিশ্চিত হলেন ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হবে, কেউই পূর্ণ ক্ষমতার দাবি করতে পারবে না। তখনই নির্বাচন দিলেন কারণ ঝুলে থাকা দুটি দলকে সে নিজের পিছনে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে পারবেন৷ রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার কোন কারণ থাকবে না৷ কিন্তু নির্বাচনের পরেই সব গেলো গুলিয়ে। এখন তাঁর গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চুল টেনে ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে। শালারা ঠিকঠাক রিপোর্ট দিতে পারলে কি তিনি কোনোদিন নির্বাচন দিতেন! কিন্তু তিনিও প্রতিজ্ঞা করেছেন, এই বাঙালী কালো জানোয়ারদের পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হবে না। তাতে যা যা করার তিনি করবেন। যত রক্ত ঝড়াতে হয় তিনি ঝড়াবেন৷
বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু যেভাবে (শেষ পর্ব)
সেই রক্ত ঝড়াতেই ‘অপারেশন ব্লিৎজ’ এর অংশ হিসেবে জেনারেল টিক্কা খানকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বেলুচিস্তানের কসাই খ্যাত টিক্কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসকের। বেলুচিস্তানে এক আন্দোলন দমনে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিলেন জেনারেল টিক্কা। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের শায়েস্তা করতেও তাঁর বিকল্প খুঁজে পান নি ইয়াহিয়া। টিক্কার সহযোগি করে গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাও ফরমান আলীকে। এদের দুজনকে দিয়ে বন্দুকের নলের সামনে ফেলা হবে বাঙালী জাতীকে। তবে মার্চের ৭ তারিখ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে যেভাবে আন্দোলিত হয় সাধারণ জনতা তাতে খানিকটা এলোমেলো হয়ে যায় তাদের পরিকল্পনা। যতটুকু শায়েস্তা করলে বাঙালী সোজা হবে বলে ভাবা হয়েছে এখন দেখছে আরো বড় কিছু করতে হবে৷ একদিকে ইয়াহিয়া আর তাঁর দোসরেরা ভাবছে কতবড় ধাক্কা দেওয়া যায় বাঙালীকে। অন্যদিকে ৭ই মার্চের পর দেশব্যাপী শুরু হয়েছে অহিংস অসহযোগ। মানুষ এখন আর সরকারের কথা শুনছে না। তারা শুনছে তাদের বঙ্গবন্ধুর কথা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের পরপরই তারা সকল সরকারি কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ করে দিয়েছে৷ আমলা কিংবা সরকারি কর্মকর্তারাও তাকিয়ে আছে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে কি প্রেস নোট আসে সেটার দিকে। রাষ্ট্র ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর না হলেও জনগণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামীলীগকেই যেন এদেশ পরিচালনার অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। ৭ই মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারি খাজনা বন্ধ, অফিস ও কোর্ট বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ৯ই মার্চ এই অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কিত সংশোধিত নির্দেশ জারি হয়। আওয়ামীলীগ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ জানান, কলকারখানার কাঁচামাল কেনা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়া ব্যাংক কাউকে টাকা দিতে পারবে না৷ এছাড়া হরতাল – অবরোধ অব্যাহত থাকবে। পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয় জান্তা সরকার বিরোধী গণজাগরণ।
বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু যেভাবে (শেষ পর্ব)
আওয়ামীলীগের প্রণীত এ অসহযোগ আন্দোলন চারিদিকে সমর্থিত ও সাফল্য লাভ করতে থাকে। মার্চের ১১ তারিখ তাজউদ্দীন আহমদ জনতাকে এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান। তবে পরদিন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় দেশের অভ্যন্তরে অরাজকতা সৃষ্টি করছে কিছু ভারতীয়। তারা কয়েকজনকে পাকড়াও করেছে বলেও দাবি করা হয়৷ তবে এটা ছিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ঘোলাটে করার জন্য ইয়াহিয়ার চাল। যে চালের অংশ হিসেবে সে ইতোমধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে দিয়ে পোষা কুকুরের মতো ঘেউঘেউ করাচ্ছে। মার্চের ১৪ তারিখ ভুট্টো বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি মোতাবেক পার্লামেন্টের বাইরে সংবিধান সংক্রান্ত সমঝোতা ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে পৃথকভাবে দুটি সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক”। ভুট্টোকে দিয়ে একথা বলিয়ে ইয়াহিয়া রওনা দিয়েছিলেন ঢাকার পথে৷ বড় ধামাকা করার শেষ প্রস্তুতি হিসেবে তাকে ঢাকায় আসতে হয়। শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা – আলোচনা খেলার ফাঁকে সৈন্যদের তৈরি করে ফেলতে হবে বাঙালীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। বাঙালীর কতটুকু রক্ত ঝড়াবে সেটা হিসেব কষতে কষতেই ইয়াহিয়ার মন অস্থির হয়ে ওঠে৷ আকলিমের কথা মনে পড়ে তাঁর, মনে পড়ে কচি মেয়ের কথা। তারও আগে মনে পড়ে শ্যাম বর্ণের মিসেস শামিমের কথা। যে শামিমকে বার কয়েক বিছানায় ধ্বস্ত না করতে পারলে তার কাজে মন বসবে না।মার্চের ১৬ তারিখ ইয়াহিয়া – মুজিবের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন বসে দ্বিতীয় বৈঠক। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল মন্ত্র ৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান চায় বঙ্গবন্ধু। বাঙালী জনগণ চায় পশ্চিম পাকিস্তানী শোষণের হাত থেকে মুক্তি। কিন্তু ইয়াহিয়া মনে মনে ভাবে শুধু আকলিমের কথা। আকলিমকে সে ভালোবেসে ‘মোটি’ নামে ডাকে৷ বাঙালী জনা কতেক নারীকে নিয়ে বিছানায় সময় কাটাতে গিয়ে তাঁর কামুক মন আকলিমকে কল্পনা করেছে৷ ১৭ তারিখ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দর সঙ্গে আলোচনার খেলা শেষে সামরিক জেনারেলদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইয়াহিয়া তাদের জানিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত করে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করে ফেলবে৷ সুতরাং জরুরী ভিত্তিতে কিছু করা প্রয়োজন৷ জেনারেল টিক্কা খান জিওসি মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজাকে সামরিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে বলে৷ ‘অপারেশন ব্লিৎজ’কে পাশে সড়িয়ে প্রণীত হয় বাঙালী হত্যার নীল নকশা ‘অপারেশন সার্চ লাইট ‘। বঙ্গবন্ধুর এদিন ছিল ৫১ তম জন্মদিন। ইয়াহিয়া মনে মনে ভাবে নিচু কালো জাতের বাঙালীকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো শেখ মুজিবের জন্মদিনে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ হবে সবচেয়ে বড় উপহার। স্বাধীনতার আশায় জেগে ওঠা বাঙালীর ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট ‘ প্রয়োগের প্রাক প্রাথমিক পরীক্ষা করা হয় ১৯ মার্চ। সেদিন সামরিক বাহিনী জয়দেবপুরে গুলিবর্ষণ ও কারফিউ জারি করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু বিদ্রোহী কন্ঠে বলেন, “তারা যদি মনে করে থাকে যে বুলেট দিয়ে জনগণের সংগ্রাম বন্ধ করতে সক্ষম হবে, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে “। তারা যে সত্যি সেদিন বোকার স্বর্গে বাস করছিল তা তারা বুঝতে পারে ৯ মাস পর।
বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু যেভাবে (শেষ পর্ব)
২০ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু – ইয়াহিয়া চারবার বৈঠক করে ফেলেন। কিন্তু বারবার ইয়াহিয়ার অসৌজন্যমূলক আচরণে তাঁর বুঝতে বাকি থাকে না যে এসব আলোচনার কোন ফল নেই। অহিংস পথে বাঙালীকে শোষণের হাত থেকে মুক্ত করার আর পথ নেই। পূর্ব নির্ধারিত ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন পুনরায় স্থগিত করা হতে পারে বলেও সন্দেহ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি পরদিন তাঁর বাসভবনের সামনে অপেক্ষমাণ বিরাট জনতার সামনে ভাষণ দেন। সেখানে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ” সাড়ে সাত কোটি মানুষের দাবি পশ্চিম বাংলার শাসনের ভার নিজেদের কাঁধে নেওয়া। এ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের গতি কোনোভাবেই মন্থর করা যাবে না”। এ ঘোষণার পর ২২ মার্চ এক অসাধারণ ঘটনার সাক্ষী হয় সবাই। প্রতিটি সংবাদ পত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার ছবি ছাপা হয়। এমন অসাধারণ ঘটনার পরপরই জল্পনা কল্পনা ভেঙে দিয়ে পূর্বঘোষিত পরিষদের অধিবেশন পুনরায় স্থগিত করা হয়। বাঙালী বুঝে যায় শোষণের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন ভাবে কিছু ভাবতে হবে৷ রাজনীতি সচেতন মানুষের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও কায়েমি জান্তা সরকারের ধোঁকা বুঝতে পারে। সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করলেও বাঙালীর নেতাকে যে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে দেওয়া হবে না তা সবাই বুঝতে শুরু করে। কিন্তু এসব ধোঁকার কথা চিন্তা করলেও সাধারণ মানুষ কখনো বুঝতে পারে নি সামনে তাদের জন্য কতবড় ভয়ানক এক অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে।বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম নিজ হাতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ২৩ মার্চ, তাঁর নিজ বাসভবনে। তিনিও সম্পূর্ণ বুঝে যান এখন আর সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। বাঙালী যদি মুক্তি চায়, নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে চায়, একটু ভালো থাকতে চায়; তবে বড় কিছু করতে হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামীলীগকে অন্য দিকে মনোযোগ সড়িয়ে রাখতে ইয়াহিয়া খান ভিন্ন আঙ্গিকে একটি কাজ করেন। ২৪ মার্চ সকাল ও সন্ধ্যায় ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতাদের সঙ্গে দুদফা বৈঠকে ব্যস্ত রাখা হয় তাদের। তাদের ব্যস্ত রাখা হয় এ কারণে যে সামনে বাঙালীদের জন্য কতটা ভয়ানক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে সেটা বুঝতে না দেওয়া।

২৫ শে মার্চ, বাঙালীর ভাগ্য আকাশে চিরদিন মনে রাখার মতো অন্ধকার নিয়ে আসে৷ সেদিন রাতের ভয়াবহতা সারাবিশ্বের কাছে জাতিগত নির্যাতনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে উত্থাপিত হয় আজ। ঢাকায় সেদিন রাত থেকে শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক নারকীয় গণহত্যা। এমন এক ভয়ানক অধ্যায়ের সাক্ষী কোন মুক্তিকামী জনতাকে হতে হবে তা কেউ কল্পনা করতে পারে নি৷ সারা শহরজুড়ে নির্বিচারে হত্যা করা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, মুহাম্মদ আবদুল মুকতাদির, শরাফত আলী, মোহাম্মদ সাদেক সাদত আলীকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা৷ বাঙালীকে মেধাশূন্য করা এ প্রক্রিয়া পাকিস্তানি শাসকেরা চালিয়ে যায় যুদ্ধের যবনিকা ঘটার আগ পর্যন্ত। সে কালো রাতে গ্রেপ্তার করা হয় বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বনে যাওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু গ্রেপ্তার হবার পূর্বেই তাঁর কাছে বাঙালীর দীর্ঘদিনের চাওয়াকে তিনি পূরণ করে যান৷ তিনি ঘোষণা দিয়ে যান,”এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে”। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা বাংলাদেশের সর্বত্র ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রেরিত হয়।

বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু যেভাবে (শেষ পর্ব)

২৫শে মার্চ রাত থেকেই ঢাকার পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসার বাহিনী সশস্ত্র গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু করে। এই প্রতিরোধ থেকেই ধীরে ধীরে বিভিন্ন পট পরিবর্তনের মাধ্যমে বাঙালী সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। পরদিন ২৬ শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকেও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রটি পাঠ করা হয়। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা এম এ হান্নান। একই জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি ঘোষণা দেন ২৭ মার্চ। ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ২৭ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক গণহত্যার দরুন মুষড়ে পড়ে পুরো বাঙালী জাতি। এমন সশস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে তেমন কোন সামরিক – রাজনৈতিক প্রস্তুতি ছিল না কারো৷ এদিকে পুরো দেশ যে মানুষটার কথায় এতদিন সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতো সেই বঙ্গবন্ধুর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বেঁচে আছেন নাকি হত্যার শিকার হয়েছেন সেটাও জানতো না কেউ। এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় নিরাপত্তার জন্য দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটতে লাগলো সবাই। প্রথমে শহর থেকে গ্রামে তারপর গ্রাম থেকে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে। ভারতীয় সিমান্ত বাংলাদেশীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সেই থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অবদানের শুরু তাদের। প্রথমে হাজারে হাজার তারপর লাখে লাখে সর্বশেষ কোটির সংখ্যায় গিয়ে দাঁড়ায় সীমান্তে নিরাপত্তার খোঁজে হাজির হওয়া বাঙালীর সংখ্যা। আর এখানেই ভুল করে ফেলে ইয়াহিয়া। পূর্ব পাকিস্তানে নরকের আগুন জ্বালিয়ে তিনি প্রিয়তম বেশ্যা সর্দারনী আকলিম আর চিত্র নায়িকা তারানার কোলে ঢলে পড়েন। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে দেশছাড়া মানুষদের দেশে ফিরতে হলে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়ানো ভিন্ন অন্য কোনো পথ তিনি রাখেন নি। দেশে ফিরতে মুখিয়ে থাকা কোটির ওপর বাঙালীর তাই কঠিন স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। অন্যদিকে এত পরিমাণ শরনার্থীর চাপ সামলাতে, ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চিরবৈরী পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়। ভারত সরকারের সরাসরি সহযোগিতার ফলেই সেবছরের মাঝামাঝি সময়ে বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধ তার সমাপনী আখ্যান শুরু করে। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের এ সামরিক – রাজনৈতিক অবদানের পিছনে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের ভূমিকা উল্লেখ না করলেই নয়। বিশেষ করে ৩১শে মার্চ কলকাতার রাজপথে বিশাল মিছিল করে ভারতীয় নাগরিকেরা।তাদের দাবি ছিল ভারতীয় সরকার যেন বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায়। যার ফলশ্রুতিতে সেদিনই ভারতীয় লোকসভা বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে। তবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে কূটনৈতিক সহযোগিতা না পেলে স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র প্রচেষ্টা চালানো যেতো না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই সেসময়কার পরাশক্তি আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়। আর সেই সুযোগে আরেক পরাশক্তি সোভিয়েত ভারতের পাশে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে এই বৈশ্বিক রাজনীতির চাল পরিবর্তন ইতিহাসকেও রাঙিয়ে গেছে ভিন্ন রঙে।

তথ্যসূত্র :

১/ দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ : আর্চার কে ব্লাড।
২/ দ্য আলটিমেট ক্রাইম : সরদার মুহাম্মদ চৌধুরী।
৩/ ম্যাসাকার : রবার্ট পেইন৷
৪/ জেনারেল ও নারীরা : আনিসুল হক।
৫/মূলধারা একাত্তর : মঈদুল হাসান।
৬/ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি : মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
৭/ নাগরিকদের জানা ভালো : মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
৮/জিয়াউর রহমান কীভাবে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হতে পারেন? :শেখ আদনান ফাহাদ

লেখক : শফিক মুন্সি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।

Continue Reading

সর্বাধিক পঠিত